পুরনো ইঞ্জিন দিয়ে চলছে লোকাল ও আন্ত:নগর ট্রেন : নান্দিনায় ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল, যাত্রীদের ৪ ঘন্টার ভোগান্তি

দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন
0
ছাইদুর রহমান ।। 
জামালপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের নান্দিনা রেলওয়ে স্টেশনে দেওয়ানগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্ত:নগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। এতে ৪ ঘন্টা ট্রেন যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হন। রোববার ৫ অক্টোবর সকাল ৮টায় এ ঘটনা ঘটে। পরে ময়মনসিংহ থেকে বিকল্প ইঞ্জিন এসে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ট্রেনটিকে নিয়ে যায়। স্থানীয়রা জানায়, দেওয়ানগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্ত:নগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেক্স ট্রেনটি নান্দিনা রেল স্টেশনে এসে থামলে ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। ট্রেন চালক বার বার চেষ্টা করেও ইঞ্জিন চালু করতে পারেনি। পরে স্টেশন মাষ্টারের মাধ্যমে খবর দেয়া হয় ময়মনসিংহ লোকোশেডে। সেখান থেকে বিকল্প ইঞ্জিন এসে পৌছায় নান্দিনায়। বিকল্প ইঞ্জিন ব্রহ্মপুত্রকে টেনে নিয়ে যায়। এছাড়াও বিকল হয়ে যাওয়া ইঞ্জিনটি ব্র্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনের পেছনের বগির সাথে সংযোগ করে লাগিয়ে দেয়া হয়। সেটিও ময়মনসিংহ নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে, ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ায় নান্দিনা রেলগেটে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। রেলক্রসিং এর উভয়পাশে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। ট্রেন যাত্রীদের মতো সড়ক পথের যাত্রীদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। আন্ত:নগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী কাজল মিয়া জানান, আমি জামালপুর থেকে ঢাকার উদ্যোশে ট্রেনে উঠি। কিন্তু নান্দিনা রেল স্টেশনে পৌছামাত্র ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ঢাকাগামী ট্রেন যাত্রী রফিকুল ইসলাম, ফরিদ হোসেন, দুলাল মিয়া জানান, ঢাকায় আমাদের বিশেষ কাজ ছিল। মনে করেছিলাম দুপুর একটার মধ্যেই ঢাকা পৌছাবো। কাজ শেষে আবার জামালপুর ফিরে আসবো। কিন্তু ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় আমাদের চারঘন্টা সময় নষ্ট হলো। কাজ শেষ করে ফেরার সময়ও চার ঘন্টা অতিরিক্ত লাগবে। এই ভোগান্তিকর পরিস্থিতি আমাদের আজ কপালে ছিল। ট্রেন যাত্রীদের অনেকেই দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিনকে জানান, জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা রেল সেকশনে যেসব ট্রেন চলাচল করে তার বেশির ভাগ ট্রেনের ইঞ্জিনের অবস্থা শোচনীয় ও পুরনো । মাঝে মধ্যেই যত্রতত্র ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। তখন ট্রেন যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়। দুই স্টেশনের মাঝখানে ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে বিপদ আরো বাড়ে। কেননা, তখন ট্রেনে চোর, ছিনতাইকারী ও মালামাল লুটপাট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরী হয়। আমরা চাই এর একটা স্থায়ী সমাধান। আধুনিক ও নতুন ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন সার্ভিস চালু রাখা হোক। নান্দিনা রেল স্টেশন মাষ্টার আল জাহিদ নোমান দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিনকে জানান জানান, দেওয়ানগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেক্স ট্রেনের ইঞ্জিন নম্বর ২৯২৫, এম ই আই-১৫ ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। পরে আমরা ময়মনসিংহে খবর পাঠাই। সেখান থেকে বিকল্প ২৯০১ নম্বরের একটি ইঞ্জিন আসে। পরে ট্রেনেটিকে নিয়ে যায় এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া ইঞ্জিনটিকেও ব্রহ্মপুত্রের পেছনের বগির সাথে বেধে দেয়া হয়। এদিকে, সোমবার (৩ মার্চ) সকাল ৮টায় একই আন্ত:নগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেক্স ট্রেনটি জামালপুর থেকে ট্রেনটি ছেড়ে আসার পর নান্দিনা স্টেশনে এসে ট্রেনটির ইঞ্জিন বিকল হয়। পরে ১০ টা ১৫ মিনিটে ময়মনসিংহ থেকে বিকল্প ইঞ্জিনের মাধ্যমে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অপরদিকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ট্রেনগুলোর ইঞ্জিন ঘন ঘন বিকল হয়ে পড়ছে। মূলত ওই অঞ্চলে চলাচলকারী ট্রেনে ব্যবহার হওয়া ২ হাজার থেকে ৩ হাজার সিরিজের ইঞ্জিনগুলো বহু আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২০০ সিরিজ, ২ হাজার ৫০০ সিরিজ ও ২ হাজার ৮০০ সিরিজের ইঞ্জিন রেলপথ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বাকি ইঞ্জিনগুলো দিয়ে ট্রেনগুলো চলছে। বিকল হওয়া ট্রেনের ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইঞ্জিনগুলোতে ইঞ্জিনের চাকা ঘোরানোর জন্য যে ট্র্যাকশন মোটর থাকে, তাতে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। তাছাড়া বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণেও ট্রেন বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে। ফলে ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বর্তমানে ময়মনসিংহ-ঢাকা-জামালপুর, ময়মনসিংহ-গৌরীপুর-ভৈরব, ময়মনসিংহ-গৌরীপুর-মোহনগঞ্জ এবং জামালপুর-চট্টগ্রামগামী ট্রেন চলাচল করে। ময়মনসিংহ জংশন হয়ে মোট ২৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। তবে ট্রেনের ইঞ্জিন সংকটের কারণে ময়মনসিংহ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জগামী দুটি লোকাল ট্রেন ও ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরগামী ধলেশ্বরী নামের একটি ট্রেনের চলাচল ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। আর নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই অঞ্চলে চলাচলকারী ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়া। গত ৭ জানুয়ারি দুটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। পরে বিকল্প ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। মূলত মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের কারণেই ট্রেন চলাচলের সময় ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। সূত্র জানায়, বিগত ১ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী ৩৮ দিনে ময়মনসিংহ অঞ্চলে একটি লাইনচ্যুত ও ১২টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। ৭ জানুয়ারি সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথের ত্রিশালের আউলিয়ানগর এলাকায় মোহনগঞ্জগামী বলাকা কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। পরে উদ্ধারকারী ট্রেন আসার দুই ঘণ্টা পর ময়মনসিংহের উদ্দেশে ট্রেনটি ছেড়ে যায়। ওই সময় ঘণ্টাখানেক ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। তাছাড়া ওনদিন সকালে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিনও সকাল আটটার দিকে বিকল হয়। পরে বিলম্বিত সময়ে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। তাছাড়া ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মোহনগঞ্জগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন ময়মনসিংহ নগরের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় ইঞ্জিন বিকল হয়। ৫ জানুয়ারি রাতে জামালপুরের তারাকন্দি থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেন ময়মনসিংহ জংশন এলাকায় ইঞ্জিন বিকল হয়ে দুই ঘণ্টা বিলম্বে যাত্রা করে। গত ২৯ ডিসেম্বর বেলা সোয়া একটার দিকে ত্রিশালের ধলা স্টেশনের আউটার এলাকায় মোহনগঞ্জগামী মহুয়া কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় দুই ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা ছেড়ে আসা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জগামী কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পিয়ারপুর এলাকায় আটকা পড়ে। একই দিন ইঞ্জিন সমস্যার কারণে ময়মনসিংহ থেকে জারিয়াগামী লোকাল ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল ও একটি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ঢাকাগামী জামালপুর কমিউটার ময়মনসিংহ জংশন এলাকায় লাইনচ্যুত, চট্টগ্রাম ছেড়ে আসা ভুয়াপুরগামী নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ জংশনে ইঞ্জিন বিকল হয়। একই দিন ত্রিশালের আউলিয়ানগর এলাকায় ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জগামী দেওয়ানগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং জামালপুর ছেড়ে আসা ঢাকাগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ময়মনসিংহ জংশনে ইঞ্জিন বিকল হয়। গত ২ ডিসেম্বর সকালে গফরগাঁও উপজেলার মশাখালী রেলওয়ে স্টেশনে জামালপুর কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। পরে বিকল্প ইঞ্জিনে ৫ ঘণ্টা পর ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সূত্র আরো জানায়, ঘন ঘন ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় ট্রেন যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। একটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হলে অন্য ট্রেনগুলোও আটকে থাকে। একটি ট্রেনের পাশাপাশি অন্য ট্রেনের যাত্রীদেরও ভোগান্তি হয়। এর থেকে পরিত্রাণে পুরাতন ইঞ্জিনগুলো বিকল হওয়ার আগেই রুটিন চেকআপের মাধ্যমে ইঞ্জিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা না হওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন হওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া ওসব ইঞ্জিন মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত মালামালের ঘাটতি আছে। স্থানীয়ভাবে মেরামত করার পর আবার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ইঞ্জিনগুলোর কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় মেরামতের পর টেকসই হচ্ছে না। লোকোশেড ও জংশন স্টেশনে দুটি বিকল্প ইঞ্জিন সার্বক্ষণিক থাকার কথা থাকলেও বিপর্যয়ের কারণে স্টকে কোনো ইঞ্জিন থাকছে না। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতেও সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশনের সুপারিনটেনডেন্ট নাজমুল হক খান জানান, একেক দিন একেক জায়গায় একেক ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হচ্ছে। সেজন্য ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। হয়রানির শিকার হওয়ায় যাত্রীদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)