![]() |
| \ মোঃ রাশেদুর রহমান রাসেল \ |
বর্তমানে যে সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থা তাতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অশান্তি বাড়ছে। বাড়ছে হতাশা। আর এ হতাশা থেকে একধরনের আগ্রাসী মনোভাবের সৃষ্টি হয়। ব্যক্তির মধ্যে নেতিবাচক দিকগুলো ফুটে ওঠে। সে আত্মবিশ্বাসী হয় না। তার মধ্যে ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি কাজ করে। নৃশংস হয়ে ওঠে। এর ফলে ব্যক্তি নিজে যেমন অন্যকে ধ্বংস করতে চায়, অন্যদিকে সে নিজেও এর শিকার হয়। এক্ষেত্রে নানা পেশার মানুষ এমনকি শিক্ষক, নারী, শিশু, বয়স্ক ও পরিবারের লোকজনসহ বাদ পড়ছে না কেউই। তবে নৃশংসতার শিকার বেশি হয় নারীরা। মূলত আমরা প্রতিনিয়ত যেসব পৈশাচিক আর হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি তা আসলে সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। এসব আমাদের অবক্ষয় আর সামাজিক সঙ্কটের চিত্র। অনেক ক্ষেত্রেই সবার অজান্তে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও অসাম্য বিস্তার লাভ করেছে ভয়াবহ আকারে।
এ ছাড়া যুবসমাজ আজ মাদকে আসক্ত হয়ে দিগ্বিদিক ঘুরছে। আজ নগর থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়েও ছড়িয়ে পড়ছে মাদকের এই ছোবল। প্রযুক্তির অপব্যবহারে ফলে নিমেষে পাল্টে যাচ্ছে সমাজব্যবস্থা। যুবসমাজ যেন আজ অস্থির আর তাই সমাজে বাড়ছে নানামুখী অস্থিরতা। নীতি-আদর্শ এবং মূল্যবোধ যেন সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
আসলে লোভ, ন্যায়বিচার, বৈষম্য, নৈতিক শিক্ষার অভাব ইত্যাদি অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে আত্মহত্যা, ধর্ষণ ও হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলছে। পারিবারিক কলহ, অশ্লীলতা, ধর্ষণ, খুন, ইভটিজিং, অ্যাসিড-সন্ত্রাস, শিশু হত্যা, নির্যাতন, মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, স্বজন, বন্ধুবান্ধব সামাজিক সম্পর্কের এমন নির্ভেজাল জায়গাগুলোয় ফাটল ধরছে, ঢুকে পড়ছে অবিশ্বাস ফলে বাবা-মায়ের হাতে সন্তান বা বিপরীত, ছাত্র-শিক্ষককে হত্যা ও লাঞ্ছিত করছে, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। আবার অজপাড়াগাঁয়েও ছড়িয়ে পড়েছে পরকীয়া, যা সমাজ অবক্ষয়ের বহির্প্রকাশ।
এসব সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজ। অথচ তারা এই দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। কোনো জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তরুণ ও যুবকদের ভূমিকা ব্যাপক। তারা আজ শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে হয়ে যাচ্ছে বখাটে, মদ্যপ, ধর্ষক ও সন্ত্রাসী। ইতিহাস-ঐতিহ্য আর ক্রমবর্ধমান সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে মানুষ তার আপন সত্তার কথা ভুলে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপকর্মে। প্রশ্ন হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কী?
বিশিষ্টজনদের মতে, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচারহীনতা ও প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ঘটছে এ ধরনের ঘটনা। সাধারণত দেখা যায় উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক সন্তানের মধ্যে মাদকাসক্ত বেড়ে গেছে। বাবা-মাও জানতে পারেন না তাদের সন্তানরা কখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে।
এ ধরনের ঘটনা রোধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যেমন আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে, তেমনি পারিবারিক সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক অনুশাসনের প্রতিও জোর দিতে হবে। যদি সন্তানদের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া যায় এবং তারা কী করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখা হয় তাহলে হয়তো সামাজিক অপরাধের মাত্রা অনেকটাই কমে যাবে।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা বইকেন্দ্রিক জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তা ছাড়া আমাদের দেশের মা-বাবারা তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠায় শুধু ভালো নম্বর পাওয়ার আশায়। ফলে সন্তানেরা নৈতিক শিক্ষা পাচ্ছে না এবং ভালো-মন্দের বিচারে অনেকটাই অপারগ। সমাজে সুস্থ সংস্কৃতি ও খেলাধুলা চর্চা না থাকায় বর্তমানে শিশু-কিশোররা স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। পাশ্চাত্যের মিডিয়ার প্রভাব অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় টিভি-সিরিজ দেখে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরেরা সহজে অপরাধ করার আগ্রহ পাচ্ছে। এ ছাড়াও সারা বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহার বৃৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক। তবে ইন্টারনেট ব্যবহার সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার ফলে মানুষ সহজে এর অপব্যবহার করছে। ফলে সাইবার ক্রাইম, অনলাইন হ্যারেজমেন্ট, সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফিসহ অনলাইনভিত্তিক অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আকাশ-সংস্কৃতির কুপ্রভাব, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও মাদকের কারণে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। বিকাশ ঘটছে সহিংসতার। এক্ষেত্রে আকাশ-সংস্কৃতি, প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব ও মাদকের বিস্তারের কারণে তাদের মধ্যে একধরনের জিঘাংসা ও মানসিক অস্থিরতা কাজ করে। ফলে ছাত্র শিক্ষককে হত্যা করছে। আবার কখনও শিক্ষককে জুতার মালা পরাচ্ছে। কখনও ছাত্র অন্যায় করলে শিক্ষক শাসনের জন্য ছাত্রকে একটি থাপ্পড় মারলে উল্টো শিক্ষকের বিচার দাবি করছে ছাত্রসহ তার পরিবার। কিন্তু এ ধরনের পৈশাচিকতা কখনও কাম্য হতে পারে না। আগে আমরা শিক্ষকের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে ভয় পেতাম। রাস্তাঘাটে দেখা হলে ছালাম দিতাম। কিন্তু এখন ছাত্ররা শিক্ষককে দেখলে ছালাম তো দূরের কথা, শিক্ষকের সামনে সিগারেট খাওয়া ও বাজে গল্পে মেতে থাকে। সবচেয়ে বেশি খারাপ চিত্র বর্তমান ছাত্রদের চুলের বখাটে স্টাইল। সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে প্রতিটি পরিবারকে হতে হবে আরও সচেতন।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন, জামালপুর।

.jpg)
সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন