মন্তব্য কলাম : সম্মাননার নামে সাহসের অপমান

দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন
0

\ মোঃ রাশেদুর রহমান রাসেল \

দেশে এখন নানা শ্রেণির সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজন একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তার মাঝে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হচ্ছে—জুলাই আন্দোলনের সাহসী সাংবাদিকদের স্বীকৃতি দেওয়া। বিগত দুঃসময়ে, যখন রাষ্ট্রীয় হুমকি, রাজনৈতিক চাপে বা প্রশাসনিক নিপীড়নের ভয় ছিল সর্বত্র, তখন কিছু সংবাদকর্মী পেশাদার দায়িত্ববোধে আপসহীন থেকে সত্য প্রকাশে অটল ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে সাহসী সাংবাদিকদের সম্মাননা দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—কিন্তু যদি সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করা হয়, তবে তা পরিণত হয় অবমাননার প্রতীকে। সম্প্রতি কিছু পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত সাহসী সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে এমন কিছু ব্যক্তিকে ‘জুলাইয়ের সাহসী সাংবাদিক’ হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, যাদের ভূমিকা জুলাইয়ের সময়কালীন সংকটে চোখে পড়ার মতো ছিল না বা আদৌ কোনো সক্রিয়তা ছিল না। অনেকের নাম গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে পরিচিত হলেও, প্রকৃত সাংবাদিকতার মানদণ্ডে তাঁরা কোথাও জায়গা পান না। কেউ কেউ আবার 'ভুয়া সাংবাদিক' পরিচয়ে বিতর্কিত। এতে একদিকে প্রকৃত সাহসিকতাকে আড়াল করা হচ্ছে, অন্যদিকে পুরো আন্দোলনের ইতিহাসকে ম্লান করে দেওয়া হচ্ছে। যে সময়টি কেটেছে তা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোরতা, তথ্য নিয়ন্ত্রণ, জনমত দমন ও বিভ্রান্তির সময়। সেখানে যারা কলমে, ক্যামেরায়, কণ্ঠে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের প্রতিটি সংবাদ, প্রতিবেদন, লাইভ কাভারেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়তা ছিল একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার দৃষ্টান্ত। সেই সাহসের মূল্যায়ন যদি দায়িত্বহীনভাবে করা হয়, তাহলে ইতিহাসের সাথে যেমন অবিচার হয়, তেমনি ভবিষ্যতের সাংবাদিকদের কাছেও বার্তা যায়—সত্য নয়, যোগসূত্রই স্বীকৃতির মাপকাঠি। সম্মাননার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাই বাছাই হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং নির্ভরযোগ্য। এর জন্য স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি থাকা জরুরি, যাদের কাজ হবে কে কবে, কোথায়, কী প্রতিবেদন করেছে—তা যাচাই করে দেখা। সাংবাদিকদের সাহসিকতা কেবল বক্তৃতার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং রিপোর্টের নির্ভুলতা, বিষয়বস্তুর গভীরতা এবং পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশের সময়টিও বিবেচ্য। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী, এসব বিষয় যাচাই করা এখন অনেকটাই সম্ভব। তাই দায়িত্বশীল আয়োজকদের উচিত হবে, কোনো চাপে বা তদবিরে নয়—তথ্য ও ইতিহাসের নিরিখে সঠিক মানুষকে স্বীকৃতি দেওয়া। তা না হলে এই সমস্ত ‘সাহসী সম্মাননা’ ভবিষ্যতে একটি হাস্যকর উদাহরণে পরিণত হবে—যেখানে সাহসের বদলে স্বার্থ, শ্রমের বদলে সম্পর্কই পুরস্কৃত হয়। এভাবে চলতে থাকলে প্রকৃত সাহসী সাংবাদিকরা আগামীর যেকোনো সংকটে নিশ্চুপ থাকতে বাধ্য হবেন, কারণ তারা জানবেন—সত্য প্রকাশের মূল্য নেই, দাম আছে শুধু পরিচিতি ও সুবিধার। তখন সাহস নয়, থেমে যাওয়াই হবে নিয়ম। সাংবাদিকতা পেশা নয়, একধরনের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার যারা পালন করেছে, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা যদি দিতে না পারি, অন্তত অবজ্ঞা তো না করি। সম্মাননা না হোক, অপমান যেন না হয়।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন, জামালপুর।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)