জামালপুর সদর উপজেলার তুলশীরচর ইউনিয়নের ডিগ্রিচরে গড়ে উঠেছে অবৈধ ব্যাটারী পোড়ানো কারখানা। একদল অসাধু ব্যবসায়ী পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে পুরাতন ব্যাটারী পুড়িয়ে সিসা তৈরী করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে চলছে। বিষাক্ত সিসা বাতাস ও পানিতে মিশে যাওয়ায় ইতমধ্যে এক কৃষকের ৫ গরুর মৃত্যু হয়েছে। একই সাথে ওই এলাকার কয়েকশত গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বুধবার সকালে উপজেলার ইটাইল ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় ব্যাটারী কারখানার ১৮ শ্রমিককে হেফাজতে নিয়েছে নরুন্দি তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ।
জানা যায়, জামালপুর সদর উপজেলার ইটাইল ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের সীমান্তবর্তী তুলশিরচর ইউনিয়নের ডিগ্রীরচর এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠেছে অবৈধ ব্যাটারী পোড়ানো কারখানা। প্রতিদিন রাতে সেখানে আগুনের কুন্ডলীতে ব্যাটারী পুড়িয়ে সিসা তৈরী করা হয়। ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির ফলে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া। এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে ওই এলাকার মানুষ ও গবাদিপশু। কৃষিজমি ও নদীর পানিতে এসব বিষাক্ত সিসা মিশে যাওয়ায় ওই এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য আজ হুমকির মুখে।
স্থানীয়রা জানায়, ব্যাটারী পোড়ানো কারখানার পাশে কৃষিজমিতে ঘাস ও নদীর পানি খেয়ে মির্জাপুর গ্রামের কয়েক শতাধিক গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে ওই এলাকার দরিদ্র কৃষক হেকমত আলীর ৫ টি গরু কয়েকঘন্টার ব্যবধানে মারা গেছে। তার পালিত বাকি ৭ টি গরু এখনো আশংকাজনক অবস্থায় রয়েছে।
ভুক্তভোগী হেকমত আলী জানান, তার কোন জমিজমা নেই। অন্যের জমিতে ঘর তৈরি করে স্ত্রী ও দুই কণ্যা সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। তার উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ছিলো ১২ টি গরু। তিনি গাভীর দুধ বিক্রি করে সংসার পরিচালনা করতেন।
তিনি আর্তনাদ করে বলেন, সন্তানের মতো করে আমি গরু গুলোকে লালন পালন করেছি। ব্যাটারীর কারখানা আমার সব শেষ করে দিলো। আমি অশিক্ষিত মানুষ, কারখানার লোকজন একবারের জন্যও আমাকে কিচ্ছু বলে নাই। তারা বললে আমি কখনো গরুগুলারে ওদের আশেপাশে নিয়ে যেতাম না। এসময় ব্যাটারী কারখানার সাথে সম্পৃক্ত সকলের শাস্তির দাবি করেন তিনি।
হেকমত আলীর মেয়ে ভাবনা ও লিমা জানান, তাদের কোন জমিজমা নাই। তারা নানা বাড়িতে বড় হয়েছে । তার বাবার শেষ সম্বল ছিলো গরুগুলো। এখন তার বাবার আর কিছুই থাকলো না।
ওই এলাকার জিয়ারুল ইসলাম জানান, হেকমত খুবই দরিদ্র কৃষক। অন্যের জমিতে গতর খেটে সে গরুগুলোকে লালন পালন করছে। হেকমতের ৫ টি গরু এখন পর্যন্ত মারা গেছে। বাকি গরুগুলোর চিকিৎসা চলছে তবে সেগুলোর অবস্থাও আশংকাজনক।
মময়মনসিংহ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ভেটেনারি সার্জন ডা. সোলাইমান সরকার জানান, সংবাদ পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে আসেন এবং ৪ টি গরু মৃত অবস্থায় পান। পরবর্তীতে তার উপস্থিতিতে আরও ১ টি গরু মারা যায়। জামালপুর এর মেডিকেল টিম অসুস্থ গরুগুলোকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে কারখানার বর্জ্য নদীতে এবং আশেপাশের জমিতে মিশে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুধু গবাদিপশু নয় এ বিষাক্ত সিসা মানব শরীরের জন্যেও ক্ষতিকর বলেও জানান তিনি।
ঘটনার পর স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কারখানার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ১৮ জনকে হেফাজতে নিয়েছে নরুন্দি তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ।
এ বিষয়ে নরুন্দি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. সজিব রহমান মুঠোফোনে জানান, জনরোষানল থেকে হেফাজত করতে কারখানার ১৭ জন শ্রমিক কে নরুন্দি তদন্ত কেন্দ্রে আনা হয়। তবে কারখানার মালিক পক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
গরু মৃত্যুর ঘটনায় ওই এলাকায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও কারখানাটির বিরুদ্ধে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়াসহ পরিবেশ দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।


সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন