নানা সমস্যায় জর্জরিত জামালপুর বিসিক শিল্পনগরীটি। দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান না হওয়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সম্ভাবনাময় এই শিল্পনগরী। সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান না হওয়ার কারণে এখানে নতুন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে তোলার বিপরীতে অনেক পুরাতন শিল্প উদ্যোক্তারা বন্ধ করে দিচ্ছেন তাদের শিল্পকারখানাগুলো।
সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুর শিল্পনগরীর ভিতরে রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা, ডুবে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, আর একটু ভারী বৃষ্টি হলেই বৃষ্টির পানি রাস্তাঘাট উপচে ঢুকে পড়ছে শিল্পকারখানায়। এতে কারখানার মালামাল ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও বৃষ্টির পানি কারখানায় ঢুকে যাওয়ার ফলে উৎপাদন থেমে যায়। ফলে কারখানার মালিকদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। আর রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার কারণে মালিক ও শ্রমিকদের অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হয়।
জামালপুর বিসিক শিল্পনগরী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৭ সালে ২৬ দশমিক ৩০ একর ওপর বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন জামালপুর প্রতিষ্ঠিত হয়। জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে দাপুনিয়া এলাকায় এ নগরী গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে দুই ক্যাটাগরিতে ১৫০টি প্লট বরাদ্দ দিয়ে শিল্পনগরীটি তার যাত্রা শুরু করে। সেই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা ১৯৭টি প্লট বরাদ্দ নেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য। পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যার কারণে এখানে স্থাপিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন। বর্তমানে এ শিল্পনগরীতে ৭৯টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে চালু রয়েছে ৬৯টি শিল্প ইউনিট। এর মধ্যে ৫টা শিল্প ইউনিট অর্থঋণ আদালতের মামলার কারণে বন্ধ হয়ে আছে আর ৫টি ইউনিট রুগ্ন হিসেবে পড়ে আছে। তবে এর মধ্যে সবগুলো ইউনিটকে পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জামালপুর বিসিকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মোট বিনিয়োগ রয়েছে ৩২,৯৭৮.৬৮ লক্ষ টাকা আর এ শিল্প ইউনিট থেকে সরকারের মোট রাজস্ব আয় ৩,২১৪.৫২ লক্ষ টাকা। ১,৩২০ জন পুরুষ আর ১,২৯৩ জন নারীসহ মোট ২,৬১৩ জন লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে এ শিল্পনগরীতে।
শিল্পনগরীটির একপাশে বিশাল এলাকা জুড়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় সন্ধ্যার পরেই এখানে শুরু হয় নেশাখোরদের উৎপাত। তাছাড়াও শিল্পনগরীর ভিতরের সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকার কারণে সন্ধ্যা নেমে এলেই গোটা এলাকায় ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আর অরক্ষিত শিল্পনগরীর রাস্তাগুলো এখন ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন যানবাহনের পার্কিং হিসেবে। এর ফলে গাড়ির ড্রাইভাররা একদিকে যেমন বিনা ভাড়ায় গাড়ি পার্কিং করতে পারছে, আর রাতের বেলায় ড্রাইভার-শ্রমিকরা মিলে নিরাপদে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্ত লোকসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের অসদাচরণের মুখে প্রায়ই বিপদে পড়তে হচ্ছে কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের। আর এসব কারণেই মূলত ব্যাহত হচ্ছে শিল্পনগরীর অগ্রযাত্রা। দীর্ঘদিনেও বিসিক শিল্পনগরীটির অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নির্মিত শিল্পকারখানাগুলো। আর সমস্যাগুলোর কারণে নতুন করে কোনো উদ্যোক্তা এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলেও জানা গেছে। দীর্ঘদিনেও সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে জামালপুর বিসিকের উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
বর্তমানে বিসিক শিল্পনগরীটিতে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। এখানকার রাস্তাঘাট, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধময় আবর্জনায় নোংরা পরিবেশ আর রাতের বেলায় নেশাখোরদের আনাগোনা এখানকার শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে আছে। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে প্রতিষ্ঠানের মালিকরা তাদের কারখানার মালামাল পরিবহনে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিসিকের রাস্তা দিয়ে পণ্য পরিবহনে কার্গো বা ট্রাক তো দূরের কথা, ভ্যান দিয়েও মালামাল পরিবহন করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। ফলে মালিকদের পণ্য রিক্যারিংয়ে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
শিল্পনগরীর ব্যবসায়ী আজমেরী ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক আশরাফুল আলম বলেন, দিনের বেলায় যেমন-তেমন রাতে শিল্পনগরীটি চলে যায় অপরাধী আর নেশাখোরদের দখলে। সন্ধ্যার পর হিজড়া আর মাদকসেবীদের ভয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন কারখানায় কর্মরত কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা। তবে কী কারণে এখানকার রাস্তাঘাট-ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে না তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই ভালো জানেন। মাহমুদ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিচালক হাসান আলী বলেন, অবহেলা আর অযত্নের কারণে এই শিল্পনগরীটি দিনে দিনে তার জৌলুস হারাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, নেশাখোরদের নিয়ে কোনো কিছু বললে যে কোনো সময় আমাদের বিপদ হতে পারে। এছাড়াও অনেক মহিলা শ্রমিক বখাটে আর নেশাখোরদের দ্বারা প্রতিনিয়ত ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার কথাও জানান। বিসিক এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে এখানকার নোংরা আবর্জনা আর দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট আর সুনসান নীরবতা। দিনের বেলাতেও একা চলতে ভয় পান বিসিকে বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকরা। আবার বর্ষাকালে এখানে জমে হাঁটু-কোমর পানি। সে সময় বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ে কারখানাগুলোতে। তখন আর তাদের কষ্টের সীমা থাকে না।
জামালপুর বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক খান মিলন বলেন, বিসিকের অবস্থা ভালো নেই। এখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করার মতো কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। তিনি বলেন, এখানে কোনো মালিক-কর্মচারীর নিরাপত্তা নেই। এই বিষয়গুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে বারবার বসেও কোনো কাজ হয়নি। নতুন নতুন অনেক উদ্যোক্তা আসে কিন্তু এখানের পরিবেশ দেখে ফিরে যায়। আর ড্রেনেজ নির্মাণের ভিতরের কাজ মোটামুটি শেষ হলেও বিসিক থেকে পানি বের করার জন্য আউটলাইন নির্মাণের কাজ শুরু না করায় স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা হচ্ছে না। যার ফলে বৃষ্টির পানি বের না হতে পেরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে চলছে। আর বারবার যথাযথ কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হয়ে বিদ্যুৎবাতির ব্যবস্থা না করতে পারায় আমরা আন্দোলন পর্যন্ত করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি।
জামালপুর বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ও আরসিআই কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক রফিক আহম্মেদ বলেন, জামালপুর বিসিক শিল্পনগরীর সমস্যার শেষ নেই। সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা আন্দোলনও করেছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর নিরাপত্তা প্রাচীর না থাকায় এখানকার শিল্পকারখানাগুলোর নিরাপত্তা নেই। দিনের বেলাতেই এখানে ভুতুড়ে পরিবেশ বিদ্যমান থাকে, রাতে তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। এই শিল্পনগরী থেকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পেয়ে থাকে অথচ শিল্পমালিকদের সমস্যাগুলো সমাধানের তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। অনেকেই এখানে শিল্পকারখানা করতে আসলেও নানা সমস্যা আর প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ফিরে যায়।
জামালপুর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক সম্রাট আকবর শিল্পকারখানার বিভিন্ন সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন আগে শিল্পনগরীটি নির্মিত। পর্যায়ক্রমে শিল্প এলাকার রাস্তাঘাট ও ড্রেন উঁচু করার ফলে সমস্যা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৮০০ মিটার ড্রেনের মধ্যে শিল্পনগরীর ভিতরের ৭০০ মিটার ড্রেন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। বাকী ১০০ মিটার আউটলাইন ড্রেনেজ নির্মাণ কাজ শেষ হলে পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক হবে। এজন্য আমরা সড়ক ও জনপথের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। তারা অতি দ্রুত একাজ করার আশ্বাস দিয়েছে। এ কাজটুকু শেষ হলে পানি নিষ্কাশনের আর সমস্যা হবে না। আর বিদ্যুৎবাতির ব্যবস্থা-সহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রকৌশলীর সাথে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।


সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন