নিজস্ব প্রতিবেদক \
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর কয়েকদিন বাকি। জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনে ৯ জন প্রার্থী থাকলেও আগেকার দিনের ন্যায় ভোটারদের মাঝে তেমন সাড়া নেই। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ছাড়া অন্যান্য প্রার্থীদের নেই তেমন প্রচারণাও। গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো ৯ জন প্রার্থীর দল ও প্রতিকের ধারণা নেই। সরকারিভাবে কিছু প্রচারণা থাকলেও গণভোট সম্পর্কেও গ্রামের মানুষের মাঝে উৎসাহ-নিরুৎসাহ নেই। গণভোট সম্পর্কে মানুষের মাঝে ইতিবাচক-নেতিবাচক কোন প্রভাবও পড়েনি। বরং নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ থাকা, নাথাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসছে।
চরগোবিন্দির কৃষক সেলিম মন্ডল (৪৬) জানান-বিএনপি’র প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের ধানের শীষ মার্কা চিনি। আর কোন প্রার্থী ও মার্কা জানি না। ইসলামি দল বলতে-কেও কয়, আল্লাহর দল, দাঁড়িপাল্লা ভারি। কেও কয়, হাতপাখা। ইসলামি কোন দলের কোন মার্কা জানি না। গণভোট সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই।
ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের ছবিলাপুর গ্রাম থেকে ৩ জন প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এদের মধ্যে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী সাদিকুর রহমান শুভ সিদ্দিকী (কাপ-পিরিচ), সদ্য বিএনপি থেকে ইসলামী আন্দোলনে যোগদানকারী আলহাজ ইঞ্জিনিয়ার দৌলতুজ্জামান আনছারী (হাতপাখা) এবং গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত লিটন মিয়া (ট্রাক) প্রতিকে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন।
শুভ সিদ্দিকী জানান-তপসিল ঘোষণার আগে থেকেই আমি মাঠে আছি। নিজ এলাকা ছাড়াও পাশের ইউনিয়নেও-তাঁর পরিচিতি ঘটিয়েছেন। ওই গ্রামের আরেক প্রার্থী দৌলতুজ্জামান আনছারীর মার্কা হাতপাখা সম্পর্কে সচেতন ভোটাররা ধারণা পেয়েছেন। বিগত দিনের উন্নয়নে আনছারীর অবদানের কথাও প্রচারিত হচ্ছে। অপরদিকে তরুণ নেতৃত্ব এবং শুভ সিদ্দিকীর দাদা আবদুর রহমান সিদ্দিকীর ভাষা ও স্বাধীনতা সংগ্রামে টানা ১২ বছর কারাবন্দির ইতিহাসের অবদানকে সামনে টানছেন। একই গ্রামের আরেক প্রার্থী লিটন মিয়ার কোন প্রচারণা না থাকায় দু’টি উপজেলার ভোটারদের মাঝে তার মার্কার পরিচিতি ঘটাতে পারেননি। তাছাড়া মনোনয়ন কনফার্মের দিনেই মাদারগঞ্জের দলীয় নেতা-কর্মীরা লিটনকে অবাঞ্চিত করেছে। এতেই শেষনয়, তাঁর দলীয় কর্মীরা জামাত-বিএনপিতে যোগদানও করেছে। ইতোমধ্যেই তাঁর অপহরণ নাটকের খবর প্রকাশের পর মাঠ ছেড়েছেন তিনি। সব মিলে একই এলাকায় ৩ জন প্রার্থী থাকায় আঞ্চলিকতার টানে-বিভক্তি থাকলেও, বিজয়ের স্বপ্ন নিয়ে শুভ সিদ্দিকী প্রচারণায় এগিয়ে আছেন।
ওদিকে ইসলামি আন্দোলন মেলান্দহ শাখার সভাপতি মুফতি আনোয়ার হোসাইন আরিফ মনে করেন-প্রচারণা কম-বেশির উপর ফলাফল নির্ভর করবে না। আমরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। আমরা হ্যাঁ ভোট এবং পিআর পদ্ধতির জন্য কাজ করছি।
এই আসনটি আগে থেকেই নৌকার ভোটার বেশি। স্বাধীনতার আগে বা পরে নৌকা ছাড়া অন্যদল আসন পায়নি। নৌকাবিহীন এই দূর্গে বিএনপি’র ধানের শীষ নিয়ে হানা দিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। দলীয় নেতা-কর্মীরা এই এলাকাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। বিএনপি’র হেভিওয়েট প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, জয়-পরাজয় আল্লাহর হাতে নির্ধারিত। এই কথায় আমি বিশ্বাসী। তবে জনগণ আমার সাথে আছেন। সেই জন্য জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি নিজাম উদ্দিন (৭৭) জানান-বিগত নির্বাচনের ইতিহাসে এই এলাকায় নির্বাচনী হট্রগোল কিংবা কেল্লাবেল্লার কথা মনে করে কেন্দ্রে যাওয়া ঝুঁকি মনে করছেন ভোটাররা।
অপরদিকে জামাত মনোনীত আলহাজ অধ্যাপক মাও. মুজিবুর রহমান আজাদী (দাঁড়িপাল্লা)’র প্রচারণা থাকলেও, সমমনা আরেকটি দল ইসলামি আন্দোলন মনোনীত দৌলতুজ্জামান আনছারীর (হাতপাখা) মার্কা নিয়ে ভোটারা দ্ধিধায় পড়েছেন।
এ ব্যাপারে জামাত প্রার্থী মাও.মুজিবুর রহমান আজাদীর নির্বাচনী সমন্বয়ক এবং মেলান্দহ উপজেলা জামাত আমীর ইদ্রিস আলী মিলিটারি জানান- দু’টি ইসলামি দলের প্রতিক নিয়ে সাধারণ অসচেতন মানুষের মাঝে দ্ধিধা থাকলেও, মানুষের মাঝে আমাদের প্রতিক সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা দিতে পেরেছি। এটাও কোন সমস্যা নয়। নির্বাচনে বড় বাধা হচ্ছে, আমাদের এজেন্ট এবং কর্মীদের হুমকি-ধামকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি।
নারী উদ্যোক্তা একমাত্র স্বতন্ত্র মহিলা প্রার্থী ও মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম ফারজানা ফরিদ পুথি ফুটবল মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। মাঠপর্যায়ে তাঁর প্রচারণা কম। এ বিষয়ে পুথি বলেন, প্রতিনিয়ত আমাকে এবং আমার কর্মীদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমাকে এজেন্ট দিতে দিবে না। এমনও হুমকি পাচ্ছি। বিগত দিনে আমি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্ধিতা করেছি। এই পরিচিতি নিয়েই আমি ভোটারদের দ্বারে ঘুরছি। ইলেকশন সুষ্ঠু হবে। ভোট কেন্দ্রে আমার এজেন্ট না থাকলেও বিজয় হতে সমস্যা নেই।
গণসংহতি আন্দোলন মনোনীত ডা.ফিদেল নঈমের মাথাল মার্কার নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যানার ফেস্টুন তেমন নেই। তবে তিনি বিভিন্ন হাট-বাজারে পথসভায় তাঁর পিতা নঈম জাহাঙ্গীর কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এবং ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রখ্যাত নেতা আমানুল্লাহ কবীরের বংশধর সূত্রে পরিচিত হচ্ছেন। নির্বাচনকে ঘিরে জনগণের সাথে এই প্রার্থীর কাঙ্খিত সম্পৃক্ততা নেই।
মাদারগঞ্জ উপজেলার একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী শিবলুল বারী রাজু চেয়ারম্যান সূর্যমুখি ফুল নিয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। রাজু মূলত: জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সদস্য। ইতোপূর্বে তিনি সিপিবি’র মনোনীত জাতীয় সংসদ এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সমিতির বহুল আলোচিত প্রতারিত গ্রাহকদের আমানতের টাকা উদ্ধার আন্দোলনের কর্ণধার হিসেবেও সাড়া জাগিয়েছেন। সচেতন মহল মনে করেছিল, উপজেলার একমাত্র প্রার্থী হিসেবে আঞ্চলিক টান দিলে নির্বাচনের হিসেব পাল্টে যেতে পারে। সূধিমহলে রাজুর ব্যক্তি পরিচিতি থাকলেও, কর্মী-বাহিনীর অভাবে তৃণমূলের ভোটারের কাছে তিনি যেতে পারেননি। এ ব্যাপারে রাজুর ছেলে এবং নির্বাচন পরিচালনার প্রধান সমন্বয়ক রাজিম মিয়া জানান-আঞ্চলিকতার টানের আশংকায় আমাদের মনোনয়ন বাতিল করানো হয়েছে। পরে আপিলের মাধ্যমে মনোনয়ন ফিরে পেতে সময় চলে গেছে। আমাদের কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। সবমিলে আমরা জিম্মি দশায় আছি। এজন্য আমরা বাহ্যিক প্রচারণার চেয়ে তৃণমূলের ভোটারদের দ্বারস্থ হচ্ছি। মাদারগঞ্জের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে আমরা সফল হবো ইনশা-আল্লাহ।
একই আসনের জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গল প্রতিকের প্রার্থী আলহাজ মীর শামসুল আলম লিপটনের কাঙ্খিত প্রচারণা নেই। ভোট যুদ্ধ ও প্রচারণায় দলীয় নেতা-কর্মীদের কাঙ্খিত বিচরণও নাই। এ নিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদেরও ক্ষোভ। তৃণমূলের ত্যাগী নেতা মিজানুর রহমান জানান-এত আগে মাঠে নেমে লাভ নেই। পোস্টার-ব্যানার ছাপতে সময় লাগছে। এ ব্যাপারে লিপটন জানান-দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে একটা পর্যায়ে পৌছেছি। কয়েকদিন মাদারগঞ্জে ছিলাম। এখন থেকে পুরোদমে মেলান্দহ মাঠ নেমেছি। জয়ের ব্যাপারে তিনিও আশাবাদী।
মাদারগঞ্জের কলেজ ছাত্র নতুন ভোটার মুশফিকুর রহমান (১৯) এবং মমেনাবাদ এলাকার জগলু কামার (৪০) মনে করেন-এবার লড়াই হবে বিএনপি ও জামাতের মধ্যে। শুভ এবং আনছারির ভোটও আছে।
সচেতন নাগরিক ছাড়া সাধারণ মানুষ ইসলামি আন্দোলন মনে করে ভোট দিবে জামাতের মার্কায়। আবার জামাত মনে করে ভোট দিবে ইসলামি আন্দোলনের মার্কায়। এমনটাই মনে করছেন-উন্নয়ন কর্মী শামসুল আলম খাজা।
সমাজ চিন্তক ও সচেতন ভোটার মো: মোরশেদুল আলম জানান-ভোটার উপস্থিতি এবং ভোটদান নির্বিঘ্ন হলে এই আসনে বিএনপি, জামাত এবং বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবার সম্ভাবনাই বেশি।
বিএনপি’র একাধিক নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, আমাদের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল আরো কয়েকবার নির্বাচনে হেরে গেছেন, এবার তিনি সুযোগ নিতে না পারলে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ব্যাপক ক্ষতির আশংকা আছে। এই নির্বাচনকে আমরা জয়ের মালা নিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
সচেতন মহলে আলোচিত হচ্ছে যে, সারাদেশের ন্যায় এই আসনের আ’লীগ-বিএনপি’র মতো জামাতেরও একক ভোট ব্যাংক আছে। কওমী ঘরানারও ইসলামি দলগুলো বিচ্ছিন্ন ভোট ব্যাংক আছে। এই ভোট মূলত: বৃহৎ হেফাজতের অংশ। যা ইত্তেফাকুল ওলামা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন, ইসলামি শাসনতন্ত্র, খেলাফত মজলিশের ভোট ব্যাংক। জামাতের সাথে খেলাফত মজলিশের ঐক্য, বিএনপি’র সাথে জমিয়তে ওলামার ঐক্য এবং চরমোনাইয়ের দল ইসলামী আন্দোলনের একক নির্বাচনের কারণে এই ভোট ব্যাংক ছত্রভঙ্গ হয়েছে। ফলে ঐক্য এবং অনৈক্যের প্রশ্নে ইসলামী ভাবধারার ভোটগুলো একত্র হতে পারবে না। ভোটের মাঠে এই দ্ধিধা বিভক্তির তালগোল ইসলামী দলগুলোকে চরম বিপাকে ফেলে দিতে পারে। ভোটের হিসাব নিকাশ এবং সুবিধাজনক বিবেচনায় ইসলামী দলের ঐক্যের নির্বাচন হলে কাঙ্খিত সুবিধা পেত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটা না থাকায় ইসলামী দলের জয়-পরাজয় খুব একটা প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। যদি প্রভাব ফেলে ধরে নিতে হবে, চলমান রাজনীতিবিদরা মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যার্থ হয়েছে। যদি ইসলামী দলের বিজয় হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে বৃহৎ রাজনৈতিক দলের কবর রচনার ইঙ্গিত এবং তারেক জিয়ার গুপ্ত-সুপ্ত বক্তব্যের সত্যতার মিল আছে। সবশেষে বলতে হবে রাজনীতির শেষ বলতে কিছু নেই। অতএব সাধু সাবধান।


সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন