তৃষ্ণা’ ছবির স্বত্ব রক্ষায় শেরপুরে প্রতিবাদী প্রদর্শনী, ঢাকায় প্রথম প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠে ক্ষোভ ও আবেগ

দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন
0

সুলতান আহমেদ ময়না, শেরপুর জেলা প্রতিনিধি ।।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্র শিল্পী নীতিশ রায়ের কালজয়ী ছবি ‘তৃষ্ণা’র স্বত্ব সংরক্ষণ ও বিকৃত উপস্থাপনার প্রতিবাদে শেরপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিবাদী প্রদর্শনী। রবিবার (১৯ এপ্রিল) বিকেলে শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চকবাজার প্রাঙ্গণে এ আয়োজন করে ‘তৃষ্ণা’র প্রতিবাদী প্রদর্শনী বাস্তবায়ন কমিটি, শেরপুর।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট সমাজসেবিকা রাজিয়া সামার ডালিয়া। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেরপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ এবিএম মামুনুর রশিদ পলাশ।
প্রতিবাদী এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন ঐতিহাসিক ছবি ‘তৃষ্ণা’র সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তি—ছবিটির মা কুমুদিনী কোচ এবং সেই সময়ের শিশু রিতা কোচ। তাদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে আবেগঘন করে তোলে। বক্তারা বলেন, ‘তৃষ্ণা’ শুধু একটি ছবি নয়, এটি বঞ্চিত মানুষের জীবনসংগ্রাম ও মানবতার এক অনন্য দলিল।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোখলেসুর রহমান জীবন, প্রথমস্থান অধিকারী জাতীয় পুরুস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট রেডিও ও টেলিভিশন কণ্ঠশিল্পী তৃপ্তি কর, কবি ও সাংবাদিক রফিক মজিদ, জনউদ্যোগ শেরপুরের সদস্য সচিব মো. আব্দুল হাকিম, জামালপুর মুক্তি সংগ্রাম যাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা উৎপল কান্তি ধর, কোচ সম্প্রদায়ের নেতা যুগল কিশোর কোচ এবং মানবাধিকার কর্মী সানজিদা জেরিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জনউদ্যোগ শেরপুরের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ঢাকায় সর্বপ্রথম ‘তৃষ্ণা’ ছবির বিকৃত উপস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ব্যক্তিদের অন্যতম তৃপ্তি কর তার অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালে পেনসিল নামে একটি গ্রোপে শওকত তমাল এক ব্যাক্তি তৃষ্ণা ছবিটি পোস্ট করে “আমি যখন প্রথম দেখি ছবিটি অন্যের নামে প্রচার করা হচ্ছে, তখন গভীরভাবে ব্যথিত হই। এটি শুধু একটি ছবির স্বত্ব লঙ্ঘন নয়, ইতিহাস ও মানবতার প্রতি অবমাননা। তাই ঢাকায় আমরা প্রথম প্রতিবাদ জানাই এবং পরবর্তীতে শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের সচেতন মানুষ একত্রিত হয়ে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।”
তিনি আরও বলেন, “অ্যাডভোকেট মোখলেসুর রহমান জীবনসহ ঢাকার সচেতন মহল, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং শেরপুরের গণমানুষ একসঙ্গে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন বলেই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ঐক্যই আমাদের শক্তি।”
বক্তারা জানান, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক ব্যক্তি ‘তৃষ্ণা’ ছবিটি নিজের বলে দাবি করে প্রকাশ করলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শেরপুর থেকে শুরু করে ঢাকার সচেতন মহল তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ছবিটি মুছে ফেলতে বাধ্য করে। যদিও পরে সাময়িকভাবে নীতিশ রায়ের নামে পোস্ট করা হলেও তা আবার সরিয়ে ফেলা হয়, যা আরও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
প্রধান অতিথি এবিএম মামুনুর রশিদ পলাশ বলেন, “নীতিশ রায়ের ‘তৃষ্ণা’ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ ধরনের শিল্পকর্মের স্বত্ব রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।”
বিশেষ অতিথি অ্যাডভোকেট মোখলেসুর রহমান জীবন বলেন, “শিল্পকর্মের স্বত্ব লঙ্ঘন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভবিষ্যতে কেউ এমন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এসময় কুমুদিনী কোচ ও রিতা কোচ আবেগাপ্লুত হয়ে নীতিশ রায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এই ছবির মাধ্যমেই তাদের জীবনের কষ্ট ও সংগ্রাম বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানে প্রয়াত নীতিশ রায়ের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মৃতিচারণ করা হয় এবং তার সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিবাদী প্রদর্শনীর পর শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নীতিশ রায়ের তোলা বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রদর্শন চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। পরে ‘সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতায় যুব জাগরণ’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবেশনায় ছিল ‘ভাবের তরী’ শেরপুর।
উল্লেখ্য, এই আয়োজনের সহযোগিতায় ছিল জনউদ্যোগ শেরপুর, রক্তসৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, হিউমিনিটি অব শেরপুর, প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এছাড়া প্রিপ ও ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি) সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে।
প্রতিবাদ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক চেতনার সম্মিলনে এই আয়োজন শেরপুরে এক তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)