সময় গড়িয়ে গেছে পুরো একটি বছর। ক্যালেন্ডারের পাতায় বদল এসেছে, কিন্তু বদলায়নি শেরপুর জেলার তিনটি পরিবারের বুকের হাহাকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো তিন তরুণ শিক্ষার্থীর স্বজনরা আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
গত বছরের ৪ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে শেরপুর শহর। সেই দিনই রাজপথ রঞ্জিত হয় তিন তরুণের রক্তে। শহীদ হন এইচএসসি পরীক্ষার্থী সবুজ মিয়া (১৮), শেরপুর সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র মাহবুব আলম (২১) এবং সেকান্দর আলী ডিগ্রি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শারদুল আশীষ সৌরভ (২১)।
শ্রীবরদী উপজেলার রূপারপাড়া গ্রামের সবুজ মিয়া পড়াশোনার পাশাপাশি একটি ওষুধের দোকানে কাজ করতেন অসুস্থ বাবার সংসার সামলাতে। আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শহরে গিয়েছিলেন তিনি। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কলেজমোড়-খরমপুর সড়কে একটি মিছিল থেকে ছোড়া গুলিতে সবুজ লুটিয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় তার প্রাণপ্রদীপ।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা সমেজা বেগম। কাঁপা গলায় বলেন, “আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। আমি শুধু খুনিদের ফাঁসি চাই।”
সবুজের মৃত্যুর আধঘণ্টা পর আবারও মিছিল বের করে ছাত্র-জনতা। ঠিক তখনই পেছন দিক থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর যৌথ টহলে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি চাপা দেয় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মাহবুব আলম ও শারদুল আশীষ সৌরভ।
মাহবুব ছিলেন পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়াতে ফ্রিল্যান্সিং করে সংসারে সহায়তা করতেন। তার মা মাহফুজা খাতুন বলেন, “আমি চাই আমার ছেলের হত্যাকারীরা শাস্তি পাক। তবে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন শাস্তি না পায়।”
সৌরভ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। গ্রামের ইন্টারনেট সমস্যার কারণে শহরের মেসে থেকে পড়াশোনা ও ফ্রিল্যান্সিং করতেন। তার বাবা সোহরাব হোসেন বলেন, “মিছিলে দাঁড়িয়ে ছিল আমার ছেলে। পেছন থেকে আসা গাড়িটা তাকে কেড়ে নিল। এখন শুধু ন্যায়বিচার চাই।”
এই তিন হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্বজনরা সদর থানায় পৃথক তিনটি মামলা করেন। চলতি বছরের ৩০ জুন পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করলেও, সবুজ ও মাহবুব হত্যা মামলায় অনেক প্রকৃত অপরাধীর নাম না থাকা এবং নিরপরাধ ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে বাদীরা নারাজি আবেদন করেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক জেলা আহ্বায়ক মামুনুর রহমান বলেন, “আমরা তিন ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। একই সঙ্গে চাই—কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়।”
এক বছর পরও শেরপুরের সেই তিনটি পরিবার প্রতিদিন একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়—কবে মিলবে ন্যায়বিচার? শহীদের রক্তের দায় কবে নেবে রাষ্ট্র? উত্তরের অপেক্ষায় আজও পথ চেয়ে আছে তিনটি শূন্য ঘর, তিনটি ভাঙা হৃদয়।

সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন