শ্রীবরদীতে জামায়াত নেতা হত্যা: সংঘর্ষে সাংবাদিক-সেনাসহ বহু আহত, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, ইউএনও–ওসি প্রত্যাহার

মোঃ সাইদুর রহমান সাদী
0
শেরপুর প্রতিনিধি
নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সামনের সারির চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে নিহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমের মরদেহ বুধবার বিকেল পাঁচটায় তার নিজ উপজেলা শ্রীবরদীতে পৌঁছে। পরে শ্রীবরদী কলেজ মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত হয়ে জড়িত বিএনপি নেতাকর্মীদের বিচারের দাবিতে স্লোগান দেন।
রাত সাড়ে আটটায় নিজ গ্রাম গোপালখিলায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে নিজ বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় কয়েক হাজার মানুষের ঢল নামে।
এদিকে জামায়াত নেতা রেজাউল করিম হত্যার ঘটনায় ঝিনাইগাতি থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মোঃ কামরুল ইসলাম জানান, রাতেই মামলা গ্রহণ করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনায় ঝিনাইগাতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার বিকেল তিনটার দিকে ঝিনাইগাতি উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই বসে থাকা জামায়াত নেতাকর্মীদের একটা পাস খালি করে দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা বসতে দিতে বলেন আয়োজন কর্তৃপক্ষ জামাত সমর্থকরা তার না মেনে নিলে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি ও চেয়ার ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয় এবং মুহূর্তেই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয় পক্ষের অনেকে আহত হন।
পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এলেও পরে ঝিনাইগাতি বাজারে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। এতে মিনি স্টেডিয়ামে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর সন্ধ্যার আগে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিনি স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। এ সময় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা উত্তেজিত জনতার দিকে না যেয়ে বিকল্প পথে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও নুরুজ্জামান বাদল প্রধান সড়ক দিয়েই উত্তেজিত জনতার দিক দিয়েই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন ও বিএনপিদের কথা অমান্য করে
তিনি হ্যান্ড মাইকে বিএনপি নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে উত্তেজিত জনতার দিকে এগিয়ে গেলে দুই পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দফায় দফায় চলা সংঘর্ষে এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের এক পর্যায়ে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে রাস্তায় আহত অবস্থায় পাওয়া যায় পরে তাকে উদ্ধার করে শেরপুর হয়ে ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে রাত ৯টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। সংঘর্ষে তিন সাংবাদিক, এক সেনা সদস্যসহ দুই পক্ষের অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন।
ঘটনার পর থেকেই ঝিনাইগাতি, শ্রীবরদীসহ পুরো জেলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাতে জামায়াতের উদ্যোগে শেরপুর শহরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। জেলাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বুধবার বিকেলে ঝিনাইগাতি উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শেরপুর-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল সংঘর্ষের জন্য জামায়াতকে দায়ী করে বলেন, জামায়াত পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
অন্যদিকে রাতে শ্রীবরদীতে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল রেজাউল করিম হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ইউএনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর নির্দেশনা দেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নুরুজ্জামান বাদল বলেন, প্রকাশ্যে পিটিয়ে আমাদের নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, যার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। অথচ এখনো একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, উপজেলা প্রশাসন সব প্রার্থীকে অনুষ্ঠানটিতে আমন্ত্রণ জানালেও জামায়াতের নেতাকর্মীরা দুপুর সাড়ে বারোটা থেকেই গিয়ে সব চেয়ার দখল করে বসেন। পরে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা কিছু চেয়ার ছেড়ে দিতে বললেও তারা রাজি হননি। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, বারবার জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলকে সংঘর্ষ এলাকা এড়িয়ে বিকল্প পথে যেতে অনুরোধ করা হলেও তিনি তা মানেননি এবং জোরপূর্বক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এই সংঘর্ষের দায়ভার বিএনপি নেবে না, দায় সম্পূর্ণ তাদের।
রুবেল জানান, সংঘর্ষে গুরুতর আহত নলকড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল সভাপতি আমজাদ হোসেনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ঝিনাইগাতি যুবদল নেতা সাইফুলসহ অনেকেই গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঝিনাইগাতি হাসপাতালে ৮ জন এবং শেরপুর হাসপাতালে আরও অনেকে ভর্তি আছেন। অনেক আহত ব্যক্তি বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সংঘর্ষে নেতাকর্মীদের বহু মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া তিনজন সাংবাদিক আহত হন। তারা হলেন—বাংলাদেশ সাংবাদিক সংস্থা ও এখন টিভির সাংবাদিক জাহেদুল ইসলাম সৌরভ, এসএ টিভির সাংবাদিক মহিউদ্দিন সোহেল এবং এখন টিভির ক্যামেরাম্যান মোরাদ হাসান। সাংবাদিকদের মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করা হয়।
তিনি বলেন, “কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। সব ঘটনার ভিডিও ফুটেজ আছে। প্রকৃত দোষীদের বিচার হোক—আমিও সেটাই চাই।” পাশাপাশি তিনি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান এবং বলেন, অনুষ্ঠানে যদি বিভিন্ন দলের জন্য আলাদা করে বসার ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে এমন ঘটনা এড়ানো যেত।
শেরপুর জেলা পুলিশ সুপার কামরুল ইসলাম জানান, রাতে মামলা গ্রহণ করা হবে এবং বর্তমানে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। মামলার আসামিদের বিষয়ে এজাহার দায়ের না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা সম্ভব নয় বলেnও জানান তিনি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)