মন্তব্য কলাম সৃজনশীলতা বনাম বস্তুনিষ্ঠতা: কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সাংবাদিক এক নন

দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন
0
\ মোঃ রাশেদুর রহমান রাসেল \
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ আমাদের জীবনকে করেছে অনেক বেশি সহজ ও গতিশীল। হাতে থাকা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগের কল্যাণে আজ যে কেউ নিজের মতামত, প্রতিভা বা সৃজনশীলতা মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারেন লাখো মানুষের কাছে। এই ডিজিটাল বিপ্লবের অন্যতম ফসল হলেন ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ বা আধেয় নির্মাতারা। তবে এই অবাধ স্বাধীনতার যুগে একটি বিতর্ক প্রায়শই সামনে আসছে-একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর কি নিজেকে সাংবাদিক দাবি করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ইতিবাচক দিক এবং সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক কাঠামোর দিকে গভীরভাবে নজর দিতে হবে। শুরুতেই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ইতিবাচক ভ‚মিকা ও সুনামের কথা স্বীকার করা অপরিহার্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করা একটি অত্যন্ত সৃজনশীল কাজ। একজন সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার নিজস্ব মেধা, ব্যক্তিগত মত, অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ কিংবা নিখাদ বিনোদনের মাধ্যমে সমাজের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করেন। বহু ক্রিয়েটর স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভ্রমণ এবং কৃষি নিয়ে চমৎকার সব তথ্যবহুল কনটেন্ট তৈরি করছেন, যা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি ভ‚মিকা রাখছে। কনটেন্ট ক্রিয়েশন আজ নিছক কোনো শখ নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ও সম্মানজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। বহু তরুণ-তরুণী এই খাতের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছেন এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। প্রথাগত মাধ্যমের বাইরে গিয়ে অনেক সময় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্পগুলোও তাদের মাধ্যমেই বৃহত্তর পরিসরে উঠে আসে। তারা সমাজকে বিনোদন দিচ্ছেন, নতুন কিছু শেখাচ্ছেন এবং নিজেদের সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখছেনÑযা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তবে সমস্যার সূত্রপাত ঘটে তখন, যখন জনপ্রিয়তা বা ভিউ বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর সাংবাদিকতার সংবেদনশীল অঙ্গনে প্রবেশ করেন এবং নিজেদের 'সাংবাদিক' পরিচয় দিতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হওয়ার আশায় অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই চমকপ্রদ বা ভুল সংবাদ পরিবেশন করা হয়। এর ফলে সমাজে যেমন বিভ্রান্তি ছড়ায়, তেমনি যারা প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিক, তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়। একজন ক্রিয়েটর যখন সাংবাদিকতার নিয়ম-কানুন না মেনে কেবল একটি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে খবরের নামে অপপ্রচার চালান, তখন তা সাংবাদিকতা পেশার প্রতি এক ধরনের মারাত্মক অবমাননা।
কনটেন্ট ক্রিয়েটররা কনটেন্ট তৈরি করবেন, সেটি খুবই ভালো কথা। কিন্তু সংবাদ পরিবেশন করা তাদের কাজ নয়, কারণ সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পেশা ও একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। সাংবাদিকতায় তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, একাধিক সূত্র নিশ্চিতকরণ এবং সত্যনিষ্ঠার একটি কঠোর প্রক্রিয়া থাকে। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে তা একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় পর্ষদের তত্ত্বাবধানের মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বস্তুনিষ্ঠতা বেশি প্রাধান্য পায়। একজন পেশাদার সাংবাদিক সর্বদা জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করেন। তার উচ্চারিত বা লিখিত প্রতিটি শব্দের আইনি, সামাজিক এবং নৈতিক দায় থাকেÑনিজের কাছে, পত্রিকা বা সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কাছে এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের আইনের কাছে।
ডিজিটাল মাধ্যমে দায়িত্বহীন আচরণের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা আমাদের আইনি কাঠামো থেকেই স্পষ্ট। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬‘-এর ধারা ২৫(১) অনুযায়ী-ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বø্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা সেক্সটরশনের অভিপ্রায়ে তথ্য, ভিডিও, চিত্র বা যেকোনো উপাদান প্রেরণ, প্রকাশ, প্রচার বা প্রচারের হুমকি প্রদান, অথবা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শন করা একটি গুরুতর অপরাধ। এই আইনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ডিজিটাল স্পেসে যা খুশি তাই প্রচার করার কোনো সুযোগ নেই। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হোন বা সাংবাদিক ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো কিছু প্রকাশ করার আগে সকলকেই আইনি ও নৈতিক সীমানার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সাংবাদিক উভয় ক্ষেত্রেরই সমাজে নিজস্ব গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একজন ভালো কনটেন্ট ক্রিয়েটর সমাজের আয়না হতে পারেন, কিন্তু তিনি সাংবাদিক নন। তাই কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সাংবাদিককে এক কাতারে ফেলা কোনোভাবেই ঠিক নয়। কনটেন্ট ক্রিয়েটররা তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে ডিজিটাল জগতকে সমৃদ্ধ করবেন, আর সাংবাদিকরা তাদের পেশাদারি ও বস্তুনিষ্ঠতা দিয়ে সমাজের প্রকৃত সত্য তুলে ধরবেন। এই দুই পরিচয়ের সুস্পষ্ট পার্থক্য স্বীকার করে নেওয়া এবং যার যার কাজের পরিধির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই হলো প্রকৃত পেশাগত সততার পরিচয়।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন, জামালপুর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)