শেরপুরে বোনকে নিয়ে প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব এবং অপমানের জেরে বন্ধু আলামিনকে পরিকল্পিতভাবে গলা কেটে হত্যা করেছে আরেক বন্ধু। হত্যাকাণ্ডের পর ঘাসক্ষেতে ফেলে রাখা মাথাবিচ্ছিন্ন অর্ধগলিত মরদেহটি পরিহিত ট্রাউজার ও জুতা দেখে শনাক্ত করেন নিহতের হতভাগ্য বাবা। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল পরিকল্পনাকারীসহ দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্ত সূত্র জানায়, গত ১৮ মে বিকেলে শেরপুর সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের নতুন বাগলগড় গ্রামের একটি নেপিয়ার ঘাসক্ষেত থেকে মাথাবিচ্ছিন্ন এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের মাথাটি শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় মেলা কঠিন হয়ে পড়েছিল। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান নিখোঁজ আলামিনের বাবা মো. সাইফুল ইসলাম। অবশেষে মরদেহের পরনে থাকা ট্রাউজার ও পায়ের জুতা দেখে তিনি নিশ্চিত করেন যে, এটি তার সন্তান আলামিনেরই মরদেহ। এই ঘটনায় শেরপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হলে এর ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই-এর জামালপুর জেলা ইউনিট।
পিবিআই-এর নিবিড় তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচিত হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, নিহত আলামিনের এক ডিভোর্সি বোনের সঙ্গে ঘাতক শুভর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও চাপা ক্ষোভ চলছিল।
একপর্যায়ে আলামিন তার বোনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য শুভকে চাপ দেয়। এরই মধ্যে শুভ একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ দেওয়ার জন্য আলামিনের কাছে ১ লাখ টাকা ধার চায়। টাকা দেওয়ার পাল্টা শর্ত হিসেবে আলামিন ঘাতক শুভর বোনকে কাছে পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বন্ধুর মুখে নিজের বোনকে নিয়ে এমন ‘কুপ্রস্তাব’ বা ইঙ্গিতকে চরম অপমান হিসেবে নেয় শুভ। সেই মুহূর্ত থেকেই আলামিনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত প্রতিশোধের পরিকল্পনা বুনে সে।
১০ হাজার টাকায় ভাড়াটে খুনি: আলামিনকে হত্যার মিশন সফল করতে শুভ তার সহযোগী সম্রাটকে মাত্র ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেয় এবং সম্রাট তাতে রাজি হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৩ মে দুপুরে আলামিনকে এক বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে কৌশলে বাগলগড় গ্রামের নির্জন ঘাসক্ষেতের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আলামিন যখন মোবাইল ফোনে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে শুভ পেছন থেকে একটি নাইলনের দড়ি আলামিনের গলায় পেঁচিয়ে ধরে টান দেয়। আলামিন যেন নড়াচড়া করতে না পারে, সেজন্য সহযোগী সম্রাট তাকে শক্ত করে চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর শুভ নিজের কাছে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে নির্মমভাবে আলামিনের গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ ও মাথাটি ঘাসক্ষেতের গহীনে লুকিয়ে রেখে তারা পালিয়ে যায়।
পিবিআই জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই পিবিআইয়ের একাধিক টিম মাঠে নামে। মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে শেরপুরের বাগলগড় গুচ্ছগ্রাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি শুভকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জামালপুর সদর উপজেলার পাথালিয়া এলাকা থেকে সহযোগী সম্রাটকে আটক করা হয়। ঘাতকদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও নাইলনের রশি জব্দ করেছে পুলিশ।
আদালতে হাজির করা হলে প্রধান আসামি শুভ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া মোটরসাইকেলের মালিক শান্তও আদালতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ সুপার আরও জানান, মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে এবং জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।



সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন