ছিমছাম গোছের ছোট্ট একটি গ্রাম তিরুথা। জামালপুর জেলা শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত তিরুথা একটি পরিচ্ছন্ব এবং আদর্শ গ্রাম হিসেবে সমাদৃত। যে গ্রামে কোন নিরক্ষর লোক নেই। বাল্যবিয়ে হয় না। সকল শিশু বিদ্যালয়গামী। কোন শিশুই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে না। মাদকের আগ্রাসন নেই। মামলা মোকদ্দমা নেই। গ্রাম বিবাদ নেই। শত বছরের ইতিহাসে কোন খুন খারাবি বা অপমৃত্যুর তথ্যও জানা নেই কারো। তিরুথায় কোন বেকার ছেলে, মেয়েও নাই। এক কথায় বলা যায় আদর্শ গ্রাম।
এ গ্রামের উর্বর মাটির সন্তান জাহাঙ্গীর সেলিম। যার এআইডি অনুযায়ী নাম মো. জাহাঙ্গীর আলম। ১৯৬৭ সালের ১০ মে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হোমিও ডাক্তার ছিলেন। মা ছিলেন আদর্শ গৃহিনী।
মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে জামালপুর শহরের মার্চেন্ট একাডেমি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। এরপর বাবার মৃত্যুর পর গ্রামে এসে তিরুথা সত্যপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভর্তি হন। তিরুথা নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর জামালপুর শহরের সিংহজানি বহুমূখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি, নান্দিনা মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি এবং সরকারি আশেক মাহমুদ মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন।
জাহাঙ্গীর সেলিম অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালিন অবস্থায় গ্রাম থেকে নিরক্ষরতা অভিযান শুরু করেন। গ্রামবাসীর সহায়তায় তিনি নৈশবিদ্যালয় স্থাপন করেন। এলকায় গড়ে তুলেন বিত্তহীন সমবায় সমিতি নামে একটি সংগঠন। যে সমিতির মাধ্যমে এলাকায় নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে সঞ্চয়ী মনোভাব সৃষ্টি করেন। নিরক্ষরতার পাশাপাশি গ্রাম থেকে দারিদ্রতার অভিশাপ মুক্তির আন্দোলন শুরু করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশ নেন।
কলেজে ভর্তি হয়ে সামাজিক কাজের পাশাপাশি বামধারার ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। তবে রাজনীতিতে তিনি ধারাবাহিক না থেকে সামাজিক কাজেই বেশী আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮৩ সাল এসএসসি পাস করার পর সংবাদ লেখার নেশা থেকে একটি জাতীয় সাপ্তাহিক মশাল পত্রিকায় জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৮৫ স্থানীয় সাপ্তাহিক জামালপুর বার্তা নামে জনপ্রিয় পত্রিকায় বার্তা বিভাগে যোগ দেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি সংবাদ পত্র ও সামাজিক কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৮৭ সালে স্নাতক পাস করার পর ১৯৮৮ সালে ২ মে উন্নয়ন সংঘ নামে একটি বেসরকারি সংস্থায় যোগ দেন।
জাহাঙ্গীর সেলিম শৈশবে আমির উদ্দিন নামে একজন মহৎ প্রাণের মানুষের সংস্পর্শে আসেন। সামাজিক ও মানবিক এবং সাহিত্য কর্মে তিনি আমির উদ্দিন সাহেবের কাছ থেকেই অনুপ্রাণিত হন। জামালপুর সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের চরশি কান্দারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আমির উদ্দিন তিরুথা গ্রামে লজিং মাস্টার হিসেবে আশেক মাহমুদ কলেজে পড়তেন। এলাকার শিশুদের বিকাশে আমির উদ্দিন চঞ্চল সংঘ নামে একটি শিশু-কিশোর সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে নিয়মিত সাহিত্য ও নাট্যচর্চার পাশাপাশি খেলাধূলার আয়োজন থাকতো। আজকের জাহাঙ্গীর সেলিম হয়ে উঠার পিছনে শৈশবের চঞ্চল সংঘের অবদান অনস্বিকার্য।
জাহাঙ্গীর সেলিম কলেজে অধ্যয়নের সময় নবাঙ্কুর নামে একটি শিশুর- কিশোর সংগঠনের সাথেও যুক্ত হন।
জাহাঙ্গীর সেলিম সামাজিক কাজ করতে গিয়ে অসংখ্যবার ঝুঁকি মোকাবেলা করে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিশেষ করে জামালপুর যৌনপল্লী থেকে তিনি পাচার হয়ে আসা ৯৪ জন অসহায় মেয়েকে পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার করেছেন। শিশু আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত আইনের সংস্পর্শে ও সংঘাতে আসা ২৩৫ জন শিশুকে জটিলতা বা হয়রানী মুক্ত করে পরিবারে পুনর্বাসন করতে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে। একাজে সহায়তা করেছে উন্নয়ন সংঘ, সেভ দ্যা চিলড্রেন, ইউনিসেফ, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও আইনজীবীরা।
জাহাঙ্গীর সেলিম দেড় শতাধীক নির্যাতনের শিকার, হারিয়ে যাওয়া, পথ ভুলে চলে আসা শিশু, নারী ও অজ্ঞাত লোকজনদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে।
২৫ জন প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তিকে পুনর্বাসনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে। চলতি বছর প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বন্ধুসভার সহায়তায় প্রতিবন্ধিতার শিকার মতি মিয়ার পরিবাকে মুদির দোকান করে দিয়েছে। দুইজন গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মান করে দিয়েছে।
জাহাঙ্গীর সেলিম গত পাঁচ বছরে তিন শতাধীক পারাবারিক ও সামাজিক বিরোধ মিমাংসা করে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছ থেকে শ্রেষ্ট কমিউনিটি পুলিশিং হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে। তার গ্রামে কোন বিবাদ এলাকা না থাকলেও অন্য এলাকা থেকে অসহায় মানুষ ন্যায়বিচার ও অধিকার পাওয়া আসায় তার কাছে এসে ভরসা পান। তিনি তিরুথায় নিরপেক্ষ একটি বৈঠকখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতি শুক্রবার ও শনিবার সালিশ বৈঠকগুলোর আয়োজন করা হয়। তার মাধ্যমে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম অন্য এলাকার চেয়ে পৌরসভার ১২ নং ওয়ার্ডে অনেক বেশী কর্মতৎপর।
জাহাঙ্গীর সেলিম ২৫০ জন দরিদ্র রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি, রোটারি ক্লাব, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম, রোগী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সুস্থ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। প্রতিনিয়তই তিনি জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করে হতদরিদ্র রোগীদের সার্জারিসহ জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকেন।
জাহাঙ্গীর সেলিম দুই শতাধীক বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রশাসনকে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। জামালপুরে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সামাজিক জাগরণে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
জাহাঙ্গীর সেলিম ধর্ষণ, মাদক, নারী, শিশু নির্যাতন, নদী দখল, বৃক্ষনিধন, অবৈধ বালু উত্তোলন, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন অসঙ্গতি ও সমাজবিরোধী এবং মানবকল্যাণ বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখছেন। গত ১৬ বছরে ১৬০টির অধীক মানববন্ধনের আয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছেন জাহাঙ্গীর সেলিম।
জাহাঙ্গীর সেলিম পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষে এলাকায় উদয়ন পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিদিন ছাত্র, ছাত্রী ও পাঠকপ্রিয় ব্যক্তিরা বই পড়তে পাঠাগারে আসেন।
বহুমাত্রিক কাজের পাশাপাশি জাহাঙ্গীর সেলিম সুস্থধারার সংবাদ কর্মী এবং বস্তুনিষ্ট সংবাদ চর্চার জন্য তিনি অনলাইন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন। জাহাঙ্গীর সেলিম ২০১৬ সাল থেকে বাংলারচিঠি ডটকম নামে অনলাইন নিউজ পোর্টাল সম্পাদনা করে আসছেন। জামালপুরে একমাত্র সরকারি নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল বাংলারচিঠি ডটকম।
জাহাঙ্গীর সেলিম দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের স্বীকৃতি স্বরুপ দুদক থেকে ব্যক্তি ও সাংগঠনিক ভাবে দুইবার পুরস্কৃত হয়েছেন। তিনি ২০০৭ সাল থেকে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাথে যুক্ত থেকে সক্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাহাঙ্গীর সেলিম। পথে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা কোন ব্যক্তিকে উদ্ধারে, হারিয়ে যাওয়া শিশুকে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার কাজে জামালপুরে যার নামটি প্রশাসন, গণমাধ্যম কর্মীসহ সাধারণ মানুষের কাছে সবার আগে উঠে আসে সে জাহাঙ্গীর সেলিম। তিনি হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্ক জামালপুর জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। যে সংগঠনের জাতীয় চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল। জাহাঙ্গীর সেলিম জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, শিশু কল্যাণ অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, জামালপুর জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতি সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন। প্রথম আলোর বন্ধুসভার সাথে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যুক্ত আছেন। বর্তমানে তিনি বন্ধুসভার উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত আছেন।
লেখক : ময়না আকন্দ, গণমাধ্যমকর্মী, জামালপুর।


সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন