শেরপুরে তুচ্ছ ঘটনার জেরে সংঘবদ্ধ যুবকদের বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন আল মুহতাছিম সাইফ (১৭) নামে এক পলিটেকনিক শিক্ষার্থী। দীর্ঘ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত সোমবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে সাইফের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা।
নিহত আল মুহতাছিম সাইফ শহরের দমদমা কালিগঞ্জ মহল্লার আব্দুল মালেক ও রেবেকা সুলতানা দম্পতির একমাত্র সন্তান। তিনি শেরপুর সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার টেকনোলজি বিভাগের প্রথম শিফটের দ্বিতীয় পর্বের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। স্থানীয় ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ মে ঈদুল আজহার পরদিন বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে শেরপুরের তাতালপুর বিএম রোড এলাকায় ঘুরতে যান সাইফ। সে সময় সাইফকে একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পার্শ্ববর্তী দিঘারপাড় এলাকার নাঈম মিয়া (১৯), পাপ্পু (২০), স্বপন (২১) ও আরমান (২০)-সহ কয়েকজন যুবক ছবি তোলার জন্য সাইফকে সেখান থেকে সরে যেতে বলে। সাইফ তাৎক্ষণিক সরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এর একপর্যায়ে ওই যুবকরা সাইফের ওপর চড়াও হয় এবং মোবাইল ফোনে আরও ১০-১৫ জন সহযোগীকে ডেকে আনে।
সন্ত্রাসী যুবকরা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সাইফকে উপর্যুপরি মারধর করে গুরুতর জখম করে। নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়, তারা রক্তাক্ত সাইফকে রাস্তার পাশে জমে থাকা মাঠের কর্দমাক্ত পানিতে চুবিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালায়। সাইফের আত্মচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। উপস্থিত জনতা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা অবস্থায় গত সোমবার দুপুরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই শিক্ষার্থী। মেধাবী ছাত্র সাইফের মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আজ মঙ্গলবার দুপুরে শেরপুর সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের উদ্যোগে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিছিলে অংশ নিয়ে সাইফ হত্যার সাথে জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেফতার এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ফাঁসির জোর দাবি জানান। মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। লাশ শেরপুরে পৌঁছানোর পর প্রথম জানাজার নামাজ শহরের দমদমা কালীগঞ্জ এলাকায় এবং দ্বিতীয় জানাজা শ্রীবরদীর ভেলুয়া ইউনিয়নের গ্রামীণ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ ব্যাপারে শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা জানান, মারধরের ঘটনার পর গত ৬ জুন ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন সাইফের মা রেবেকা সুলতানা। শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর এখন সেই মামলাটি ‘হত্যা মামলায়’ রূপান্তরিত হবে। ওসি আরও জানান, আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং ইতিমধ্যেই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।
এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর শেরপুরের সুশীল সমাজ, সচেতন অভিভাবক ও গণমান্য ব্যক্তিবর্গ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এলাকায় অপরাধের মূল শিকড় উপড়ে ফেলার জন্য তারা স্থানীয় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী যুবকদের বেপরোয়া আচরণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে বিভিন্ন জেলা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের যে ভয়াবহ রূপ দেখা গিয়েছিল, শেরপুরেও যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে—সে বিষয়ে প্রশাসনকে আগাম ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
বিচারের দাবির পাশাপাশি সচেতন মহল কয়েকটি জরুরি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ছাত্রদের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে দলবেঁধে বা জুটি আকারে (ছেলে-মেয়ে) শহরের পার্ক, নির্জন সড়ক কিংবা বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা যথাসময়ে ক্লাসে উপস্থিত থাকছে কি না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলাকালীন বাইরে ঘোরাফেরা করছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।কিশোর অপরাধের অভয়ারণ্য বা আড্ডার স্পটগুলোতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং জেলা পুলিশের বিশেষ টহল জোরদার করার দাবি জানানো হয়েছে।
এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মনে করেন, পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের এমন সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপই কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এবং সাইফের মতো আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া রোধ করতে পারে।

সরকারি মিডিয়া (ডিএফপি) তালিকাভুক্ত জামালপুরের প্রচারশীর্ষ দৈনিক-সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন অনলাইন ভার্সন । আপনার মতামত প্রকাশ করুন